যে কারণে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী – Youth Carnival
Art & Science

যে কারণে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী

এবছর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তিন বিজ্ঞানী রেইনার ওয়েস, ব্যারি সি. ব্যারিশ এবং কিপ থোর্ন নোবেল পুরষ্কার পান। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের শনাক্তকরণ বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় একটি নতুন ইতিহাস রচনা করেছে। এটাকে জোতির্বিদ্যায় একটি বিপ্লব বললেও ভুল হবে না। পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অবদান শুধুমাত্র  বিজ্ঞানের নতুন দুয়ার খুলে দেয়নি বরং অনেক পুরাতন বিষয়ের ধারণাও পরিষ্কার করে দিয়েছে। তাই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কি?

মহাবিশ্বের সৃষ্টির শুরুতে শুধুমাত্র স্থান এবংকাল (সময়) ছিল। স্থান মূলত ভর-শক্তির সমন্বয়, আর ভর সৃষ্টি হয়েছে শক্তি থেকে। তাই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে মূলত শক্তি ও সময় থেকে। ১৪শ কোটি বছর আগে ঘটে যাওয়া বিগ ব্যাঙ বা মহাবিস্ফোরণের ফলে তৈরি হয়েছে স্থান-কাল তথা মহাবিশ্ব। মহাবিশ্বে স্থান-কাল চাদরের ন্যায় ছড়িয়ে আছে, ভারী কোন বস্তু স্থান-কালে অবস্থানের দরুন স্থান-কালের এই চাদরে বক্রতার সৃষ্টি হয়।

স্থান-কালের চাদরে ভরের দরুন বক্রতার সৃষ্টি; ছবিসূত্রঃ shockingscience.com

ভর মানেই সেখানে মহাকর্ষীয় বলের উপস্থিতি। আর ভর (বস্তু) যদি গতিশীল হয় তাহলে সেখানে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। ভারী বস্তুর নড়াচড়ার কারণে চারপাশের স্থান-কালের চাদরের বক্র ঢেউয়ের ন্যায় চারিদিকে আন্দোলিত হয়। আর এই ঢেউই হল মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। মহাকর্ষীয় শক্তির বিকিরণই হল মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গের বেগ আলোর বেগের সমান। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ঢেউ স্থান-কালের বক্রতার বিচ্যুতি ঘটায়।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ; ছবিসূত্রঃ extremetech.com

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ কেন গুরুত্বপূর্ণ ???

প্রথমেই আমরা বলেছি যে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শুধুমাত্র বিজ্ঞানের নতুন দ্বারই খুলে দেয়নি বরং পুরাতন অনেক থিওরির সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ১৯১৫ সালে আইন্সটাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে বলা হয়েছিল ভর ত্বরিত হলেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সৃষ্টি হবে এবং তা ছড়িয়ে পড়বে অনন্ত ব্যাপ্তি পর্যন্ত। কিন্তু এই তরঙ্গ এতটাই দুর্বল যে, আইন্সটাইন এর শনাক্তকরণে তেমন আশাবাদী ছিলেন না।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের দরুন সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের আরো একটি জোরালো প্রমাণ মিলল। ব্লাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে অনেক থিওরি থাকলেও এর সুনিশ্চিত অস্তিত্ব নিয়ে এর আগে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ ছিল না কিন্তু মহাকর্ষীয় তরঙ্গের শনাক্তকরণের দরুন ব্লাকহোলের অস্তিত্বের ব্যাপারে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গটি শনাক্ত করেছেন তা দুটি ব্লাকহোলের সংঘর্ষের দরুন সৃষ্টি। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের মাধ্যমে আমরা এখন মহাকর্ষ বল কীভাবে কাজ করে তথা এই মহাবিশ্বের গতি-প্রকৃতি বুঝতে পারবো। মহাকর্ষ শক্তিকে কাজে লাগানোর অপার সম্ভবনা সৃষ্টি হয়েছে। তাই এখন ওয়ার্মহোলের মত ধারণার বাস্তবায়ন নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা শত শত আলোকবর্ষ দূরের ওয়ার্মহোল দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ঘুরে আসতে পারবো। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণ বিগ ব্যাঙ থিওরির সত্যতাও প্রমাণ করেছে।

ওয়ার্মহোল; ছবিসূত্রঃ howtoexitthematrix.com

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের ইতিহাস

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ  বিজ্ঞানীদের কাছে শত বছরের ধাঁধা ছিল। গত একশো বছর ধরে অনেক বিজ্ঞানী এই তরঙ্গ শনাক্তকরণের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। পৃথিবীতে আসা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বিস্তার খুবই কম (প্রায় 10−21  মত) এবং কম্পাংক মাত্র 10−16 Hz । একারণে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের জন্য খুবই সংবেদনশীল যন্ত্রের প্রয়োজন। অনেক বিজ্ঞানী এটি শনাক্তকরণের জন্য অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন কিন্তু সকলেই ব্যর্থ হয়েছিলেন। অবশেষে LIGO – Laser Interferometer Gravitational-wave Observatory  মানমন্দিরের তিন বিজ্ঞানী রেইনার ওয়েস, ব্যারি সি. ব্যারিশ এবং কিপ থোর্ন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণে সফল হন।

LIGO System; Image Credit: ligo.org

LIGO হলো L – আকৃতির মানমন্দির (যেখানে জ্যোতির্বিদ্যার বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়)। যার দুটি ট্যানেল (প্রতিটি ৪ কিলোমিটার করে) দিয়ে লেজার (আলো) পরিভ্রমণ করে। LIGO যন্ত্রটি এতটাই সংবেদনশীল যে এটি একটি প্রোটনের দশহাজার ভাগের এক ভাগ পরিমাণ দৈর্ঘ্যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রভাবে সৃষ্ট বিচ্যুতিও মাপতে সক্ষম।  LIGO এর ট্যানেল দিয়ে লেজার ছুড়ে মারার পর হিসাব করা হয় সেটি ৪ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে কত সময় নিল। যদি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের দরুন স্থান-কালের বিচ্যুতি হয় তাহলে টানেলে আলোর (লেজার)পরিভ্রমণের পথ বাড়বে বা কমবে। ফলে উক্ত দূরত্ব অতিক্রম করতেও সময় কম বা বেশী লাগবে। এখন টানেলের দৈর্ঘ্য হলো একটি প্রোটনের দশ হাজার ভাগের একভাগ। তাহলে বুঝুন এত সূক্ষ দূরত্বে বিচ্যুতি মাপতে গেলে কত সংবেদনশীল যন্ত্রের প্রয়োজন!
আসলে পৃথিবী ও সূর্যের মহাকর্ষের দরুন সৃষ্ট তরঙ্গ এতই দুর্বল যে তা শনাক্ত করা একেবারেই অসম্ভব। তাই বিজ্ঞানীদের এমন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রয়োজন ছিল যা অনেক ভারী কোন বস্তুর সংঘর্ষ হতে সৃষ্ট। আর LIGO এরকম একটা তরঙ্গই শনাক্ত করেছে। তাদের শনাক্তকৃত তরঙ্গটি 1.3 বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে সূর্যের চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ ভারী দুটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল।

কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছিল LIGO প্রজেক্টে?

শত বছরের ধাঁধা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। আইন্সটাইন ভুল নাকি সঠিক? এই উত্তরটি পেতে বিজ্ঞানীদের শত বছর ধরে শুধু গবেষণাই করেননি বরং শত কোটি ডলার খরচও করেছেন। ১৯৯৪ সালে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানী রেইনার ওয়েস, ব্যারি সি. ব্যারিশ এবং কিপ থোর্নের হাত ধরে শুরু হয়েছিল LIGO। ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের গবেষণায় প্রায় 1.1 বিলিয়ন ডলার গুণতে হয়েছিল LIGO কে। অর্থাৎ শত বছরের চেষ্টা আর শত কোটি ডলারের বিনিময়ে আমরা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ধাঁধার সমাধান করতে পেরেছি ।

সুতরাং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরনের ন্যায় অসামান্য অবদানের জন্য উক্ত তিন বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া যথার্থই হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা এস্ট্রোনমির কল্পকাহিনীর বাস্তবায়ন দেখতে পাব খুব শীঘ্রই।

Comments

comments

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top