প্রথম প্রথম চাকরি খোঁজার প্রক্রিয়াটিতে যতটাই উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করে ততটাই কাজ করে ভয়; সময়ের সাথে এই ভয়ার্ত অনুভূতি কেটে একটি একঘেয়ে ভাব চলে আসে। আর সেই সাথে আমাদের মনে হতে থাকে আমরা হয়তো যেকোনো ধরনের চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে যথেষ্ট প্রস্তুত এবং এই জায়গাটিতেই আমরা সাধারণত ভুল করে ফেলি। এই ভুলগুলো শুধু যে আমাদের ইন্টারভিউ বোর্ডে করি তা নয় বরং আমাদের জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি তৈরির ক্ষেত্রেও করে থাকি। যার ফলে আমাদের সাক্ষাৎকার এবং সিভি হয়ে যায় পুনরাবৃত্তিক আর অনাকর্ষণীয়। তাই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিজেকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার মতো কঠিন কাজটি করতে প্রয়োজন চতুরতা ও সূক্ষ্ম দক্ষতা- চাকরির সিভি এবং ইন্টারভিউ বোর্ড উভয়ক্ষেত্রেই। এজন্য আমাদের দরকার: ১. আকর্ষণীয় সিভি বা জীবনবৃত্তান্ত এবং ২. চিত্তাকর্ষক একটি সাক্ষাৎকার। এসকল পরামর্শ নিয়েই আজকের এই লেখাটি।

চাকরির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ: ইন্টারভিউ ; Source: northeastern.edu

আকর্ষণীয় জীবনবৃত্তান্ত তৈরির জন্য করণীয়

একথা ভুললে হবে না যে যেকোনো কোম্পানিতে আপনার সিভিই আপনার প্রথম পরিচয়। কেননা কর্মকর্তারা আপনার জীবনবৃত্তান্ত দেখেই আপনাকে সাক্ষাৎকারের জন্য আমন্ত্রণ জানান। অর্থাৎ তারা প্রথমে আপনার সিভি বিচার করেন এবং যাচাই করেন আপনি তাদের কাজের জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন ও উপযুক্ত কি-না। এজন্য সঠিকভাবে সিভি উপস্থাপন করা জরুরি।
সিভির প্রথম অসুবিধাটি ধরা পড়ে সদ্য গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে। হয়তো খুব সামান্য কিংবা একেবারেই শূন্য থাকে আমাদের অনেকের অভিজ্ঞতার ঝুলি। তাই নিজ‌ বৃত্তান্তে ইন্টার্নশীপ অভিজ্ঞতার বাইরেও এমন কিছু তথ্য উল্লেখ করুন যা আপনার কাজের সাথে সম্পর্কিত। এগুলো হতে পারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, সক্ষমতা, শখ, ইচ্ছা ইত্যাদি। লক্ষ্য রাখুন কভার লেটারে আপনার সেসকল কাজের কথাই উল্লেখ করুন যেগুলো প্রত্যাশিত কাজটির সঙ্গে মানানসই। তবে যাই বলুন না কেন চেষ্টা করুন নিজের সর্বোত্তম রূপটি তুলে ধরতে।

কভার লেটারে কাজের সাথে মানানসই আগ্রহের কথাই উল্লেখ করুন ; Source: onhold.on.ca

ইন্টারভিউ বোর্ডের বিস্তারিত

চাকরির ইন্টারভিউতে, আপনার সম্ভাব্য নিয়োগকর্তারা কেবল আপনার সিভিতে যেগুলি পড়েছেন সেগুলোই শুনতে চান না। তারা আপনার ব্যক্তিত্ব, চরিত্র বুঝতে চান। এজন্য নিজের চাকুরী ব্যক্তিত্বের বাইরে একটি বিশেষ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ করার সেরা উপায় ইন্টারভিউতে আপনার মজার ঘটনা উল্লেখ করা। কর্মকর্তাবৃন্দের সামনে এই গল্পগুলির বলা নিতান্তই সহজ নয়। কীভাবে কথায় কথায় নিজের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলবেন, জেনে নিন-

১. নিজের ব্যাপারে সত্য বলুন

নিজের সম্পর্কে মিথ্যাপ্রচার থেকে বিরত থাকুন। আপনার সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা দিয়ে নতুন কাজের শুরু করা অনুচিত। কেননা আপনার এই মিথ্যাগুলোই ভবিষ্যতে আপনার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে এবং আপনি একটি বেদনাদায়ক পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন। তাই সত্য ঘটনা দিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করুন। আপনি যা করতে পারেন না বা জানেন না, সেসব নিয়ে কথা বলে অযথা ঝামেলায় পড়ার চেয়ে নিজের অপরাগতা স্বীকার করে নিন।

সত্যই শুদ্ধতা ; Source: exeuntnyc.com

২. প্রাণবন্ত হয়ে কথা বলুন

আমরা সাধারণত এই দিকে নজর কম দেই অথচ ইন্টারভিউতে ইতিবাচক মনোভাবের সাথে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের মনোযোগ কেড়ে নেয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, যেকোনো সাক্ষাৎকারে আপনিই একমাত্র ব্যক্তি নন, ইন্টারভিউতে আপনার বলা বেশিরভাগ কথা বোর্ডের সদস্যরা অন্যান্য সবার কাছে শুনে অভ্যস্ত যার কারণে তাদের মধ্যে একটু ক্লান্তির ছাপ দেখা যেতেই পারে। তাই আপনাকে প্রাণবন্ত হয়ে কথা বলে অন্যদের থেকে আলাদা হতে হবে। বলতে পারেন নিজের শখের কাজের কথা, যদি সেটি গতানুগতিক ধারার বাইরের কোনো শখ তাহলে তো কথাই নেই। তবে আপনার আগ্রহ যেখানেই থাকুক না সেগুলো কেন উপস্থাপন করুন আকর্ষণীয়ভাবে। কাজটি অনেক ভাবেই করা যায়; আপনার গল্প বলার ধরন দিয়ে বা আপনার অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে। নিজের কথা বলুন স্বাভাবিক, স্বচ্ছলভাবে হাত নেড়ে তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত হাতের ব্যবহার পরিহার করুন। গলার স্বর সাবলীল, স্পষ্ট এবং নমনীয় রাখার চেষ্টা করুন। একঘেয়ে সুর থেকে বেরিয়ে স্বরের সাবলীল উঠানামা করান যেন আপনার কথা শুনতে কারো বিরক্তির উদ্রেক না হয়। অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলুন।

কাজের কথা উপস্থাপন করুন আকর্ষণীয়ভাবে ; Source: business2community.com

৩. আত্মবিশ্বাসী হোন

কেবল আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমেই নিজেকে যোগ্য লোক হিসেবে প্রমাণ করতে পারেন। নিজের দায়িত্বশীলতা, কাজের সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটান আপনার আচরণে। ভেতরের ভয়কে জয় করুন। সাক্ষাৎকারের সময়, মনস্থির করে শান্ত হোন এবং স্বাভাবিক, নৈমিত্তিক কণ্ঠে কথা বলার চেষ্টা করুন, যাতে আপনার ইন্টারভিউ সংক্রান্ত চাপা উত্তেজনা ধরা না পড়ে। সর্বোপরি, স্নায়ুচাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন। এজন্য পারলে ইন্টারভিউ বোর্ডে যাওয়ার আগে পরিচিত কারো সাথে কথা বলে নিজের মনকে শান্ত রাখুন।

আত্মবিশ্বাসই পারে আপনাকে সবার মধ্যে আলাদা করতে ; Source: braindirector.com

৪. প্রাথমিক জ্ঞান রাখুন

যে কোম্পানির জন্য কাজ করতে চাইছেন সেটি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকাটা আপনার জন্য যতটা না বিব্রতকর, তার চেয়ে অনেক বেশি সেই কোম্পানির কর্মকর্তাদের জন্য মানহানিকর। তাই যতটা সম্ভব কোম্পানির সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান নিয়ে ইন্টারভিউ বোর্ডে যান। অফিসের মূল লক্ষ্য বা বৈশিষ্ট্য এসবের পর্যাপ্ত ধারণা নিন। এভাবে আপনি নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন এবং আপনার এমন গুণগুলো উল্লেখ করতে পারবেন যেগুলো কর্মকর্তারা নতুন কর্মচারীদের মধ্যে দেখতে চাইছেন তখন তারা তাদের নতুন কর্মচারী হিসাবে আপনাকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হবেন না।

প্রাথমিক তথ্য সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ; Source: aeroleads.com

৫. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

কেবল ব্যক্তি জীবনে নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন কর্পোরেট জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য একটি সফল সিভি আর সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দিয়েও নিজের পরিচয় প্রকাশ করা যায়। নিয়োগকর্তারা সাক্ষাৎকারের আগেই আপনার ফেসবুক, টুইটার, লিংকড‌ইন প্রোফাইল দেখে থাকতে পারেন। এজন্য এসকল মাধ্যমে একটি পেশাদার প্রোফাইল তৈরি করে নিজেকে ইতিবাচক অবস্থানে রাখুন। উল্লেখ্য যে আপনার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলগুলোতে প্রদর্শিত তথ্যগুলো যেন বানোয়াট, মিথ্যা না হয়। যাতে আপনি এমন কোনো পরিস্থিতিতে না পড়ে যান, যেখানে সাক্ষাৎকারে আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হয়, আর তারা আপনার উত্তরের সাথে আপনার সোশ্যাল মিডিয়ার মিল খুঁজে পান না। সুতরাং আপনি যা বলছেন এবং যোগাযোগ মাধ্যমে যা কিছু করছেন উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যতা রাখা শ্রেয়।

Main social networks – Brands of Facebook, Twitter, Instagram, YouTube, Google Plus, Pinterest, LinkedIn; Source: reltonassociates.co.uk

যখন‌ই সুযোগ পাবেন সিভিতে বা সাক্ষাৎকারে এই খুঁটিনাটি কৌশলগুলো কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করুন। সবশেষে যে পরামর্শই অনুসরণ করুন কেন, চাকরিতে সাফল্যের মূল কথা হলো নিজের প্রতি আস্থা রাখা, ভীত না থাকা এবং নিজের ব্যক্তিত্ব ধরে রাখা- এসবেরর পাশাপাশি কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা বজায় রাখা।

Feature image: today.com