আয়ারল্যান্ডের রাজধানী এর দক্ষিণ ডাবলিনে ১৯৮৮ সালে ক্রামলিন শহরের এক অভাবী পরিবার জন্ম বক্সার কনর এন্থনি ম্যাকগ্রেগরের।  জন্মের সময় সাধারণ বাচ্চাদের থেকে তিনি বেশ কিছুটা খাটো ছিলেন, এজন্য তাকে নিয়ে স্কুলে নানাভাবে  হাসি ঠাট্টা করা হতো। কিন্তু কনর এসবে মনে কষ্ট পেলে খুব বেশি রাগ দেখাতে না।

কনর এর পরিবার ছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ফুটবল টিমের ডাইহার্ট ফ্যান। এদিকে তার পরিবারে সে তার দুই বোন ছাড়া অন্য কোন ভাই ছিলেন না। সেজন্য কনর এর পরিবার চেয়েছিলেন যে তাদের একমাত্র ছেলেটিও  একজন ফুটবলারই হোক। তাই পরিবারের কথা রাখতেই নাম দেন স্থানীয় ফুটবল দলে। কিন্তু খেলার মাঠে দেখা যায় যে তিনি ফুটবল খেলার চেয়ে অন্যের উপর হাত পা ছুড়ছেন বেশি।

অবশেষে একদিন তিনি ফুটবল খেলা ছেড়ে  হুট করেই ভর্তি হলেন ক্রামলিন কিক বক্সিং ট্রেনিং সেন্টারে, যা তার পরিবারের একদমই পছন্দ ছিল না। এর কারণে কনর অনেকটাই তার পরিবারের থেকে বিচ্যুত হয়ে বসেন। কিন্তু বক্সিং এর চার রিঙের মাঝে কনর ছিলেন একদম অজেয়। ত্রামলিনের হয়ে আয়ল্যান্ডের একটানা ১৯টি চ্যাম্পিয়ানশিপের ১৭টিতে টানা চ্যাম্পিয়ান হলেন তিনি।  কিন্তু এতে তার মন ভরছিল না।

তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে আরো বড় আসরে নিয়ে যেতে চাইছিলেন বারবার। তার স্বপ্ন ছিল তিনি একদিন MMA ( মিক্সড মার্শাল আর্ট ) আসরে খেলবেন, সেখানকার রিং মাতাবেন। কিন্তু তার আর্থিক অবস্থা আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়ছিল। শুধুমাত্র বক্সিং চ্যাম্পিয়ান হয়ে তার জিম এবং ট্রেনিং খরচই উঠছিল না, এদিকে পরিবার তার এসবে সাপোর্ট না করার জন্য যথেষ্ট সহযোগিতা পাচ্ছিলেন না পরিবার থেকে এদিকে তার পক্ষে MMA ( মিক্সড মার্শাল আর্ট ) এর স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়াও সম্ভব হচ্ছিল না। উপায়ন্তর না পেয়ে তিনি  বেঁছে নিয়েছিলেন পাইপ মিস্ত্রীর কাজ। সারাদিন তিনি মিস্ত্রী হিসাবে কাজ করতেন আর রাতে গিয়ে ট্রেনিং যোগ দিতেন। এসময় মাত্র ঘণ্টা তিনি সময় পেতেন ঘুমানোর জন্য। তবে এরপর তিনি পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা আয় করতে পারতেন না যেটা দিয়ে তার থাকা খাওয়া, জিমের ট্রেনিং খরচ আসবে। প্রায় সময়ই তিনি তার নানা বন্ধুদের বাসায় থাকতেন। ২০০৩ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত আশা না ছেড়ে এভাবেই দিন কাটিয়েছিলেন কনর।

তবে কনর এর দিন ফিরতে খুব বেশি সময় লাগে নাই, ২০০৮ সালে তার সাথে পরিচয় হয় ডি ডিভলিনের। আস্তে আস্তে দুইজনের মাঝে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ডিভলিন আস্তে আস্তে কনর এর আত্নবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে থাকেন, মানষিকভাবেই শুধু না আর্থিকভাবেও সহযোগিতা করে এসময় পৌঁছে দেন MMA ( মিক্সড মার্শাল আর্ট ) এর আসরে। কিন্তু শুরুটা কনর এর খুব একটা ভালো যায় নাই। প্রথম টানা ম্যাচে হতাশাজনকভাবে হেরে রিং ছাড়েন কনর। কিন্তু এই হতাশা তাকে খুব বেশি দিন বয়ে নিতে হয় নাই। প্রেমিকা ডিভলিন তার মনে সাহস যুগিয়েছেন, আত্নবিশ্বাস আবার ফেরত আনিয়েছেন এবং কনরকে প্রস্তুত করেছেন পরের ম্যাচের জন্য।

কনর এর জীবনে সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরে যায় ২০০৯ সালে। একের পর এক ম্যাচ জিতে পুরো পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেন কনর। পরিচিতি লাভ করেনদ্যা নটোরিয়াসনামে। সর্বশেষ ২৪টি যুদ্ধে কনর জয়ী হয়েছেন জয়ী ২১টিতে। এমন কোন রেকর্ড আজ আর মিক্সড মার্শাল আর্টে বাকী নেই যেটার খেতাব তিনি তার নামের সাথে লাগাতে পারেন নাই। বিশ্বের বিখ্যাত ফোবস পত্রিকার মতে ২০১৬ তে সেরা উপার্জনকারী খেলোয়াড়দের সংক্ষিপ্ত তালিকাতে ছিলেন কনর। ২০১৬ সালে তিনি জিতেছিলেন মোট ৩৪ মিলিয়ন ডলার, যা একজন কিক বক্সারের একবছরের সবচেয়ে বেশি আয়ের রেকর্ড। এই কনরই এক সময় মাত্র ৮৪ ইউরোর জন্য রিং এ নামতেন সেই কনর আজ বিশ্বরে অন্যতম সেরা উপার্জনকারী খেলোয়াড়। 

হয়ত তিনি পরিবারের কথা মতো ম্যানচেস্টার ফুটবল দলের খেলোয়াড় হতে পারেন নাই তবে সেই ক্লাবের বর্তমানের অনেক ফুটবলারের প্রিয় খেলোয়াড় কনর। এমনকি ভারতের ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন বিরাট কোহলি কিছুদিন আগে তার টুঁটারে জানিয়েছেন  যে তিনিও একজন কনরের বড় ফ্যান এবং জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই তিনি তার সংগ্রামী জীবনকে অনুপ্রেরণা হিসাবে দেখেন।

কিছুদিন আগেই কনরকে এক সংবাদ সম্মেলনে বেশ কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সেখানে জানতে যাওয়া হয়েছিল কেন তিনি কিক বক্সিং এ এতও ভালো অবস্থানের পরেও মিক্সড মার্শাল আর্ট এ আসলেন। তিনি বলেছিল – ” এটাই আমার স্বপ্ন, যেখানে আমি নিজেকে সবসময় দেখতে চাইতাম।”  তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তিনি যখন রিঙের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন তখন কীভাবে আবার ফিরে আসার সাহস পান? জবাবে তিনি বলেছিলেন – ” আমি নিজেকে হারিয়ে ফেললেই মনে করি যে আমার পাশে ডিভলন দাঁড়িয়ে আছে, সে আমাকে বলছে যে কনর তুমি পারবে। আর এটাই আমাকে সাহস যোগায়।”

দুই বছর আগে কনর ম্যাকগ্রেগর একটি ফ্যাশন কোম্পানির সাক্ষাত্কারে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি “৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে বক্সার ফ্লয়েড মেওয়েদার জুনিয়রকে খুন করতে পারবেন”। তখন অনেকের মনেই “ম্যাকগ্রেগর বনাম মেওয়েদার” লড়াই দেখার সুপ্ত বাসনা জেগেছিলো। কিন্তু যেখানে একজন ছিলো বক্সার অন্যদিকে আরেকজন ছিলো ইউএফসি রেসলার। যার কারনে সেই লড়াইটা ঘটার সম্ভাবনা একরকম ছিলো না বললেই চলে। কিন্তু পরবর্তীতে কে ভেবেছিলো তাদের সেই কাল্পনিক লড়াইটা বাস্তবে রূপ নিবে।

এক বছর ধরে প্রচুর জল্পনার পরে শেষ পর্যন্ত লড়াইটা হচ্ছে—ফ্লয়েড মেওয়েদার বনাম কনর ম্যাকগ্রেগর। একজন বক্সিং রিংয়ের কিংবদন্তি মেওয়েদার, আর তাঁর প্রতিপক্ষ মিক্সড মার্শাল আর্টসের রাজা কনর ম্যাকগ্রেগর। এবছরের ২৭ই আগস্টে আমেরিকার লাস ভেগাসে আয়োজন করা হয় মেওয়েদার ও কনর এর ম্যাচ। যার প্রাইজ মানি ছিল মোট ১ বিলিয়ন ডলার। ধরা হয় এটাই এই বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানি প্রাইজের লড়াই। যেটা খেলতে ২০১৫ সালের অবসর ভেঙ্গে রিঙে ফিরেছিলেন ৪০ বছর বয়সের আমেরিকার কিংবদন্তি মেওয়েদার। ধরা হয়, ১০ রাউন্ডের এই টান টান উত্তেজনাকর ম্যাচটি উপভোগ করেছেন বিশ্বের পুরো এক তৃতীয়াংশ মানুষ।

কনর এর মত কিংবদন্তিরা আমাদের জীবনে এক অনুপ্রেরণার বার্তা নিয়ে আসে সবসময়ই, যে মানুষটা এক সময় নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে সাধারণ পাইপ মিন্ত্রীর কাজ করতেন, অন্যের বাসার বারান্দাতে রাত কাটাতেন এখন তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে বিলিয়ন মানুষ। তাই জীবনে যত বাধা বিপত্তিই আসুক না কেন কখনই নিজের স্বপ্নকে হারিয়ে ফেলা উচিৎ নয়। কনর তার সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন – ”  আমার জন্য সেসময় গুলোর স্মৃতি কখনই সুখকর ছিল না, থাকবেও না তবে সেসব স্মৃতি এখন ও আমাকে সাহস যোগায় সামনের ম্যাচটিতে জিততে। “