কর্মক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য পরিবেশ এবং নিজের পছন্দমতো সময়ে কাজ করার সুযোগ অনেকের কাছেই আকাঙ্ক্ষিত একটি বিষয়। ব্যক্তিগত জীবন এবং কর্মজীবনের মাঝে একটি ভারসাম্য তৈরির সুযোগ করে দেয় ফ্লেক্সি টাইম। চলুন, বিস্তারিত জেনে নিই ফ্লেক্সি টাইমের ব্যাপারে।

ফ্লেক্সি টাইম কি?

ফ্লেক্সি টাইম মানে কাজের এমন এক উপায়, যা কর্মীদের তাদের ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী কাজের সময় ঠিক করার সুযোগ করে দেয়। এছাড়াও সেই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের কাজের বাইরে নিজস্ব কাজগুলো করারও সুযোগ দেয়। আর এই সময়টি প্রচলিত কর্মঘন্টার বাইরে।

Source: thedirector.com

চাকরিদাতার অনুমতি নিয়েই এই ধরনের সুবিধা ও সুযোগ পাওয়া যায়। সাধারণত সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সময়টি কর্মঘন্টা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ফ্লেক্সি টাইমে এরকম কোনো বাঁধাধরা সময় থাকে না। তাই ঘরে বসে কিংবা অফিসে থেকেও এই ধরনের কাজগুলো করা যায়। শুধুমাত্র মোট ব্যয় করা সময় যেন উভয়পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত হয়।

এটি কাদের জন্য?

কোনো চাকরিদাতার সঙ্গে যদি আপনার ২৬ সপ্তাহের কর্মসময় পার হয়ে থাকে, তবে ফ্লেক্সি টাইমের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন। আপনার বর্তমান কর্মক্ষেত্রে যদি এরকম কোনো ব্যবস্থা না থাকে, তবে এটির জন্য আবেদন করতে পারেন প্রতিষ্ঠানে।

কেমন যোগ্যতা লাগবে?

নিজের উপর বিশ্বাস থাকাটাই এই ধরনের কাজের প্রধান শর্ত। আপনাকে নিজের মতো কাজ করতে দিলে আপনি মনোযোগ দিয়ে কাজ করবেন এবং ফাঁকি দেবেন না, এই রকম বিশ্বাস থেকে চাকরিদাতা আপনাকে এই সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।

Source: fitforwork.org

তাই এখানে পারস্পরিক সমঝোতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত চাকরিদাতা বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে থাকেন। তাই তিনি চাইলেই আপনার কাজের অগ্রগতি সহজেই যাচাই করে নিতে পারবেন।

কারা এমন সুযোগ দেয়?

এটি নির্দিষ্ট করে বলার মতো কিছু নেই। কারণ প্রায় সব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেই, এই ধরনের সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন রকমের কাজ করতে হয়। পণ্য তৈরি থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপ পার হতে হয়।

Source: myoffice.com

তাই আপনার আবেদন বিবেচনায় এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী, এমন কাজে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকছে। তবে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে, আপনার সময়গুলো সঠিকভাবেই প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেবেন।

ফ্লেক্সি টাইম কোন কাজগুলোতে হয়?

অনেকগুলো উপায়েই নিজের সুবিধাজনক সময় তৈরি করা যায়। বিভিন্ন শিফটে কাজ করা, এমন একটি মাধ্যম হতে পারে। শিফটে কাজ করার অনেকগুলো ধরন হয়। যেমন-

জব শেয়ার

অনেক কাজেই এ রকম কাজের সুযোগ থাকে। দুইজন চাকরিজীবী একই কাজ দুইভাগে করেন। তাদের কাজের ধরন একই হয় এবং পারিশ্রমিকও তারা ভাগাভাগি করে নেয়। নিজের অবস্থান থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার জন্য এটি দারুণ একটি মাধ্যম হতে পারে।

খন্ডকালীন চাকরি

খন্ডকালীন চাকরি আমাদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়। প্রায় সব ধরনের ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান খন্ডকালীন চাকরির সুযোগ করে দেয়।

Source: theconversation.com

এমন চাকরিতে সাধারণত পূর্ণ সময়ের অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কম সময় দিতে হয়। ছাত্রাবস্থায় এমন সুযোগ দারুণ কাজে দেয়।

ঘরে বসে চাকরি

ঘরে বসে চাকরির সুযোগ রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানে আপনি আবেদন করতে পারেন। তবে সে জন্য নিয়োগদাতার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্র নিতে হবে। ঘরে বসে কাজ করলেই যে কর্মঘন্টা কমিয়ে দেয়া হবে, এমনটি নাও হতে পারে। তারপরও ঘরে বসে সুবিধাজনক সময়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়া দারুণ একটি ব্যাপার হতে পারে।

বাৎসরিক ঘন্টা

এই ধরনের কাজে সাধারণত বার্ষিকভাবে কর্মঘন্টা হিসাব করা হয়। তবে আপনাকে ততটুকু সময়ই দিতে হবে, যতটুকু সময়ের জন্য আপনি চুক্তিবদ্ধ।

Source: techvoi.com

কিন্তু এখানে সুবিধা হলো, বছরের যেকোনো সময়কেই নিজের ব্যস্ত সময়ে রূপ দিতে পারেন। মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে লম্বা একটি সময় ধরে কাজ করতে পারবেন কিংবা খন্ড-খন্ডভাবে যেকোনো সময়কেই কাজের জন্য পছন্দ করতে পারবেন।

শিফটে কাজ

একই চাকরিতে যখন দুই বা ততোধিক দল নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন সেটিকে শিফটে কাজ বলা হয়। যেসব কাজ সব সময়ই চালু রাখতে হয়, সেগুলোতে শিফট পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে কাজ এগিয়ে যেতে থাকে, তবে একটি নির্দিষ্ট সময় পর-পর কর্মীদের বদলি করা হয়। আর পর্যায়ক্রমে পদ্ধতিটির পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। এই ধরনগুলোতে আপনার কাজের সময় নির্ধারিত হবে, সেখানকার পরিবেশ, কাজের দায়িত্ব এবং গুরুত্ব বিবেচনায়।

ফ্লেক্সি টাইমে কর্মীর সুবিধা

এই ধরনের কাজের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে নিয়োগদাতা এবং কর্মী উভয়েরই লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে। কর্মীরা যেসব সুবিধাগুলো উপভোগ করে, সেগুলো হলো,
১. পরিবারে ছোট বাচ্চা থাকলে তাদের দেখে রাখতে হয়। কিন্তু আপনাকে যদি অফিসে গিয়ে চাকরি করতে হয়, তবে বিরাট একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এটির সমাধান হতে পারে, ঘরে বসেই কাজের সুযোগ তৈরি করে নেওয়া কিংবা খন্ডকালীন চাকরির সুযোগ।

Source: flexitimeplanner.com

২. অনেকেই আছে পরিবারকে বেশি সময় দিতে এবং পরিবারের মানুষগুলোর সঙ্গে বেশি সময় ব্যয় করতে পছন্দ করেন। তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অফিসে ব্যয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর কাজে মনোযোগের ঘাটতি কাজের মান কমিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে সমাধান নিয়ে হাজির হয় ফ্লেক্সি টাইম। কোনো বাঁধাধরা সময় না থাকায়, যখন ইচ্ছা পরিবারের মানুষগুলোকে দেখে যেতে পারেন।
৩. ঘোরাঘুরির অভ্যাস অনেকেই চাকরিজীবনে আসার পরও ছাড়তে পারেন না। তাদের জন্যও যেকোনো সময়ে কাজের সুযোগ বড় একটি ব্যাপার। দীর্ঘ একটি সময় ঘোরাঘুরি করার পর সহজেই কাজে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকে এসব চুক্তিতে। তবে নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা আপনাকে পূরণ করতে হবে।

Source: staffnet.manchester.ac.uk


৪. দীর্ঘদিন অসুস্থতা যখন ঘিরে ধরে, তখন এই ধরনের কাজের সুযোগ ইতিবাচক বিষয়। নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি, সংগঠনেও সময় দিতে পারছেন। সাধারণত বাৎসরিক কর্মঘন্টা নির্ধারণ করাই উভয় পক্ষের জন্যই বুদ্ধিমানের কাজ এসব পরিস্থিতিতে।

ফ্লেক্সি টাইমে নিয়োগদাতার লাভ

কর্মীরা এতে অনেক সুবিধা ভোগ করলেও, নিয়োগদাতাদের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং তারাও বিভিন্নভাবে সুবিধা উপভোগ করে থাকে। যেমন:
১. প্রতিষ্ঠানে কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে অনেকেই এই ধরনের নিয়োগের ব্যবস্থা করে থাকে। সাধারণত বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এই ধরনের সুযোগ বেশি তৈরি করে দেয়।
২. কাজের মান বাড়াতে বহু প্রতিষ্ঠান শিফটে কাজ কিংবা পর্যায়ক্রমিক কাজের সুযোগ দিয়ে থাকে। একই কাজ যখন কয়েকটি দল পুরো সময় ধরে করে, তখন কাজের মান বজায় থাকে। কাজের গতি কখনোই মন্থর হওয়ার সুযোগ থাকে না।
৩. একটি প্রতিষ্ঠানে অনেকগুলো বিভাগ থাকে। যাদের কাজের ধরন এবং কর্মীর সংখ্যাও আলাদা। এতোগুলো বিভাগের কাজের মাঝে ভারসাম্য তৈরি এবং সমন্বয়ের জন্য নিয়োগদাতারা ফ্লেক্সি টাইমের সুযোগ করে দেন।

Source: manchester.ac.uk

এই পুরো বিষয়টিই আপনার চিন্তা এবং পরিকল্পনার উপর নির্ভর করে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই আপনাকে সুবিধা ও অসুবিধাগুলো পরিমাপ করে নিতে হবে। যদি ফ্লেক্সি টাইম নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজের চাহিদাগুলো পূরণের মতো সক্ষমতা কমে যায়, তবে আপনার উচিৎ হবে আরও বেশি সময় দেওয়া। শুধুমাত্র বিকল্প ব্যবস্থা এবং সুযোগ থাকলে, এই ধরনের কাজের আবেদন করবেন। ভারসাম্য তৈরি করতে পারা এবং যোগাযোগ বজায় রাখতে পারাই ফ্লেক্সি টাইম তৈরির মূল বাঁধা।

Featured Images:Techvoi.com