কয়েক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং একাধিক অফিসে অসংখ্য ফোন কল করে অবশেষে একটি চাকরির ডাক পেয়েছেন। নিঃসন্দেহে একজন চাকরি প্রার্থীর জন্য এটা খুব খুশির খবর। কিন্তু এই খুশি মুহূর্তই কারো কারো জন্য দুশ্চিন্তায় রুপ নিতে পারে, যখন নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে চাকরিপ্রার্থীর কাছে জানতে চাওয়া হয় আপনার কাঙ্ক্ষিত স্যালারি কত?


অধিকাংশ চাকরিপ্রার্থী এই প্রশ্নের জবাবে নিজের কাঙ্খিত বেতনের চেয়ে কম দাবি করে। কেননা তারা মনে করে কম বেতন চাইলে তাকে অহেতুক বিব্রত হতে হবে না। এমনকি নিয়োগকর্তা তার প্রতি খুশি হবেন এবং তার চাকরি নিশ্চিত হবে।

Image: atrium staff


যারা এমন ধারণা পোষণ করেন তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, এই ধারণা ভুল। বেতনের অংক কম না বেশি নিঃসন্দেহে তার উপর আপনার বিব্রত হওয়া বা খুশি হওয়া নির্ভর করে। তবে আপনি যদি বিচক্ষণতার সাথে এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন তবেই আপনি সফল হবেন।

সম্ভাব্য বেতনের চেয়ে অতিরিক্ত বেতন দাবি করলে নিয়োগকর্তার পক্ষে যেমন তা মেনে নেওয়া কঠিন হয়, তেমনি সম্ভাব্য বেতনের চেয়ে অতিরিক্ত কম দাবি করলে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি এবং যোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সুতরাং এক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো মধ্যপন্থা অবলম্বন করা, অর্থাৎ উভয় দিকের সামঞ্জস্যবিধান করে নিয়োগকর্তাকে খুশি করা।


তবে সব সময় মাথায় রাখতে হবে যথাযথ যোগ্যতা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত দক্ষতা প্রদর্শন ছাড়া কখনোই আপনি উচ্চ বেতন আশা করতে পারেন না। তার জন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রস্তুতি। আজকের নিবন্ধে এমন প্রস্তুতিমূলক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।


সময় ব্যবস্থাপনা


আপনি নিশ্চয়ই আপনার পরিশ্রমের উপযুক্ত মূল্য পেতে চান? কিন্তু তার জন্য কি আপনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত? সবচেয়ে অলস মানুষটাও এমনই আশা করে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার বাজারে এত সহজে সব কিছু পাওয়া যায় না। নিজের উপযুক্ত সম্মানী আদায় করতে হলে আপনাকে একজন দক্ষ সময় ব্যবস্থাপক হতে হবে, অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যথোপযুক্ত কাজে ব্যবহার করা শিখতে হবে।

Image: Bellarminc Magazine

দৈনন্দিন কাজ করার পর আপনার হাতে কতটুকু বাড়তি সময় থাকে তা নির্ণয় করুন এবং সেই সময়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করুন। তাই বলে বাড়তি সময় বলতে মধ্যাহ্ন ভোজনের বিরতির পর অবশিষ্ট কয়েক মিনিট সময় বিবেচনা করবেন না। বরং দিনের যে সময়টুকু আপনি অযথা টিভি বা ইউটিউব দেখে ব্যয় করেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে পার করেন, এই সময়টা বিবেচনা করুন।


প্রতিদিন যদি ১ ঘন্টা ইউটিউব দেখতেই হয় তবে তা থেকে অন্তত ৩০ মিনিট শিক্ষামূলক কিছু দেখুন। প্রতিদিনের অবসর যাপনের কিছুটা সময় শিক্ষামূলক কোনো বই পড়ুন। প্রতিদিন সকালে সারাদিনের সংক্ষিপ্ত রুটিন তৈরি করুন। প্রয়োজনে আরো আগে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এক কথায় দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে দক্ষ সময় ব্যবস্থাপক হয়ে উঠুন।


সাফল্যের সীমানা নির্ধারণ


আপনার ইচ্ছাই আপনার শক্তি। আপনি যেমন চাইবেন আপনার ক্যারিয়ার ঠিক তেমন হবে। সুতরাং নিজের সাফল্যের সীমানা নির্ধারণ করুন। ভালো ক্যারিয়ার মানেই প্রচুর টাকা রোজগার করা নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৭০ শতাংশ কর্মী ভালো বেতন পাওয়া সত্ত্বেও তাদের চাকরি জীবন নিয়ে সুখী নয়।


Image: Medium

অধিক রোজগারের কথা চিন্তা করে যেকোনো কাজে যোগ দেওয়া ঠিক না। কেননা টাকা রোজগারই জীবনের শেষ কথা নয়। উপযুক্ত সম্মানী পাওয়ার সাথে সাথে আপনাকে ব্যক্তিগত জীবন এবং কর্মজীবনের সামঞ্জস্য করা শিখতে হবে। তেমনি ক্রমশ ব্যক্তিগত উন্নতির কথা চিন্তা করতে হবে। সাথে সাথে কাজের পরিবেশ এবং সুস্থতার কথাও মাথায় রাখতে হবে। এই সব কিছু বিবেচনা করে আপনাকে সঠিক পথে এগোতে হবে। তবেই স্বাচ্ছন্দ্য জীবন এবং উপযুক্ত সম্মানী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


আত্ম উন্নয়নে বিনিয়োগ করুন


আত্ম উন্নয়নের বিনিয়োগই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। সব সময় নিজেকে আরো উন্নত এবং উপযুক্ত করার জন্য কাজ করুন। এই বিনিয়োগ অনেক ব্যয়বহুল নয়। শুধু সদিচ্ছা এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকলেই আত্ম উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যায়।


photo: Salesforce

যেমন: আপনি নিজের জানার পরিধি বাড়ানোর জন্য নিয়মিত বই পড়া শুরু করতে পারেন। তবে ইচ্ছামত বিভিন্ন ধরনের বই পড়লেই হবে না। সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়কে সামনে রেখে বই পড়ুন। তাহলে আপনি সেই বিষয়ে আরো দক্ষ এবং উপযুক্ত হয়ে উঠবেন। আবার শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের বই ছাড়া অন্য কিছুই পড়বো না পুরোপুরি এমন ধারণা পোষণ করাও ঠিক হবে না। কেননা তাতে আপনার সার্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি বাঁধাগ্রস্ত হবে। অর্থাৎ সার্বিক বিষয়ে এমন সামঞ্জস্যতা রেখেই আত্ম উন্নয়নের চেষ্টা করুন।


সকল দক্ষতা প্রকাশ করুন


ভালো চাকরি এবং উচ্চ সম্মানী পাওয়ার জন্য ভালো বায়োডাটার বিকল্প নেই। কিন্তু মাত্র দুই পৃষ্ঠার একটি বায়োডাটায় নিজের সকল দক্ষতা এবং যোগ্যতা সম্পূর্নভাবে ফুটিয়ে তোলা অনেকাংশেই অসম্ভব। কিন্তু আপনি যদি অন্য কোনো উপায়ে চাকরিদাতার কাছে আপনার সকল দক্ষতা স্পষ্ট করে তুলতে পারেন তবে নিশ্চয়ই আপনি অন্য সাধারন কর্মীর চেয়ে বেশি সম্মানী এবং সুযোগ সুবিধা আশা করতে পারেন।


photo: Nature Blogs

আমরা চাকরির বায়োডাটায় নিজের সকল দক্ষতা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরি মাত্র, কাজ করে দেখানোর সুযোগ হয় না। তাই আপনি চাইলে একটি ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারেন। অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লিংকগুলো আপনার বায়োডাটায় যুক্ত করতে পারেন। ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে আপনার সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য এবং কাজের নমুনা সংযুক্ত করতে পারেন। চাইলে একটি ব্লগ সাইটও করতে পারেন। তবে অবশ্যই আপনাকে মনে রাখতে হবে চাকরিদাতা এমন কাউকে খুঁজছেন যিনি তার কাজ সর্বোচ্চ দক্ষতার সাথে করতে সক্ষম। এই প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখে যদি নিজের সকল দক্ষতা প্রকাশ করতে পারেন তবে উচ্চ সম্মানী নিশ্চিত করা আপনার পক্ষে সহজ হবে।


প্রত্যাশিত অংক অস্পষ্ট রাখুন


উপরে উল্লেখিত দক্ষতা ও যোগ্যতাগুলো নিশ্চিত করার পর আপনি চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুত। এবার সেই কোটি টাকার প্রশ্ন, আপনার প্রত্যাশিত সম্মানী কত? সাক্ষাৎকারের শুরুতেই কখনো প্রত্যাশিত সম্মানী নিয়ে কথা বলবেন না। তারপরও আপনাকে যদি প্রথম দিকেই প্রশ্নটা করা হয় তবে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ টেনে বিষয়টি পিছিয়ে দিন।

Image: thoughteo

নিয়োগকর্তার কাছে তাদের নিয়ম নীতি সহ কাজের অন্যান্য দিক নিয়ে আগে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করুন। এতে আপনার দক্ষতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। অধিকাংশ নিয়োগকর্তা আপনার এই প্রস্তাবে সম্মত হবেন। তারপরও যদি আপনাকে প্রত্যাশিত বেতনের কথা বলতে হয় তবে সুনির্দিষ্ট কোনো অংক না বলে সম্ভাব্য পরিসীমা উল্লেখ করুন।


নিয়োগকর্তারা জানেন একজন ভালো কর্মী উচ্চ সম্মানীর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা সম্মানী নিয়ে চিন্তিত না হয়ে বরং কর্মীর যোগ্যতা ও দক্ষতার ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হয়ে থাকেন। কোনো নিয়োগকর্তা শুরুতেই কর্মীর সম্মানী নিয়ে বেশি চিন্তিত হলে তা কোনোভাবেই ভালো লক্ষণ নয়। তাই ভুলেও নির্দিষ্ট কোনো অংক বলবেন না।

Feature Image: atrium staff